আক্কেলপুর জয়পুরহাট জেলার একটি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ উপজেলা। জনশ্রুতিতে যতদূর শোনা যায় এ এলাকায় আক্কেল কাজী নামক একজন সম্পদশালী ব্যক্তি বাস করতেন। তার নাম অনুসারে এ স্থানের নাম হয়েছে আক্কেলপুর। অন্যদিকে কথিত আছে যে, সাবেক “ইকুরকুরি”মৌজায় সপ্তদশ শতাব্দীতে হজরত শাহ মখদুম(রা:)নামক একজন ধর্মীয় সাধক সুদূর পারস্য থেকে ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন। তিনি অনুভব করেন যে এখানকার
লোকজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান যার ইংরেজি শব্দ এবং পারসিয়ান পরিভাষায় আক্কেলমান্দ নামে খ্যাত। সুতরাং স্থানীয় পত্র পত্রিকা ও শ্রুতি হতে জানা যায় যে পারস্য শব্দ আক্কেলমান্দ হতেই আক্কেলপুর নামকরণ করা হয়েছে। আক্কেলপুর জয়পুরহাট জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা। বিগত স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের সাবেক বগুড়া জেলার আদমদীঘি থানার কিছু অংশ নিয়ে প্রথমে আক্কেলপুর থানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের আওতায় উপজেলায় উন্নীত হয়।
অবস্থান: উত্তর বাংলাদেশ
সীমান্ত: পাঁচবিবি উপজেলা (উত্তরে), ক্ষেতলাল এবং জয়পুরহাট সদর (পূর্ব ও দক্ষিণে) এবং পশ্চিমে প্রতিবেশী ভারতীয় ভূখণ্ডের সাথে সীমানা ভাগ করে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
প্রতিষ্ঠা: মূলত ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি থানা (পুলিশ প্রিসিঙ্কট), পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক শুরু করা বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির অংশ হিসাবে এটিকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
জনসংখ্যা
জনসংখ্যা: প্রায় ১,৫৫,০০০+ (২০১১ সালের আদমশুমারির উপর ভিত্তি করে)
সাক্ষরতার হার: জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে
ধর্মীয় গঠন: প্রধানত মুসলিম, হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুরা উপস্থিত
অর্থনীতি এবং অবকাঠামো
প্রাথমিক অর্থনীতি: কৃষিভিত্তিক, প্রধান ফসল হিসেবে ধান, গম এবং আলু
শিল্প: ক্ষুদ্র শিল্প, চালকল এবং স্থানীয় হস্তশিল্প
পরিবহন: সড়ক ও রেলপথে সুসংযুক্ত; আক্কেলপুর রেলওয়ে স্টেশন একটি উল্লেখযোগ্য পরিবহন কেন্দ্র
প্রশাসনিক কাঠামো
১টি পৌরসভা (আক্কেলপুর পৌরসভা) এবং ৫টি ইউনিয়ন পরিষদে বিভক্ত: গোপীনাথপুর, রাইকালী, রুকিন্দিপুর, সোনামুখী এবং তিলকপুর
বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলায় অবকাঠামো এবং পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক উদ্যোগ এবং আকর্ষণগুলির একটি সংক্ষিপ্তসার এখানে দেওয়া হল:
🏗️ উন্নয়ন প্রকল্প
১. অবকাঠামোগত উন্নয়ন
যোগাযোগ এবং জনসেবা উন্নত করার জন্য উপজেলাটি বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাস্তা নির্মাণ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন সুবিধা যা বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে।
২. কৃষি উদ্ভাবন
আক্কেলপুরে মরুভূমির খেজুর চাষের মতো উদ্ভাবনী কৃষি পদ্ধতির প্রবর্তন দেখা গেছে। মুঞ্জিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম আজোয়া, মরিয়ম, সুক্কালি, আম্বর এবং বারহির মতো খেজুরের চাষ শুরু করেছিলেন। এই উদ্যোগ কেবল স্থানীয় কৃষিকেই বৈচিত্র্যময় করেনি বরং আয় বৃদ্ধির নতুন পথও খুলে দিয়েছে।
৩. সমবায় সমিতি
উপজেলা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের জন্য সমবায় সমিতিগুলিকে উন্নীত করেছে। এই সমিতিগুলি সদস্যদের কম সুদে ঋণ, আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করে। এই সমবায়গুলির মাধ্যমে প্রায় ১,৪০০ ব্যক্তি কর্মসংস্থান অর্জন করেছে, যা স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে।
🌍 পর্যটন আকর্ষণ
১. ঐতিহাসিক স্থান
আক্কেলপুর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, যার মধ্যে রয়েছে:
রাজা রামধনের বাড়ি (রামশালা)
মুকুট রাজার পরিখা (আমাত্তা)
শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউর মন্দির (১৫ শতক, গোপীনাথপুর)
রায়কালী গ্রামে কুষাণ আমলের প্রাচীন মুদ্রা
দেওড়া গ্রামে আবিষ্কৃত সূর্য ও বিষ্ণু মূর্তি
এই স্থানগুলি অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অতীতের একটি আভাস দেয়।
২. আক্কেলপুর উপজেলা মিলনায়তন
উপজেলা মিলনায়তন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অনুষ্ঠান, পরিবেশনা এবং সম্প্রদায়ের সমাবেশের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় ঐতিহ্য ও শিল্পকলা সংরক্ষণ ও প্রচারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
🏨 থাকার ব্যবস্থা
দর্শনার্থীদের জন্য, আক্কেলপুরে বেশ কিছু থাকার ব্যবস্থা রয়েছে:
জেলা পরিষদ ডাক বাংলো: আক্কেলপুরে অবস্থিত, যা ভ্রমণকারীদের জন্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে।
আজকের ঠিকানা: আক্কেলপুরে হাসপাতালের গেটের কাছে, আকন্দ মার্কেটের উপরে অবস্থিত, সুবিধাজনক থাকার ব্যবস্থা প্রদান করে।
আক্কেলপুর উপজেলা ঐতিহাসিক আকর্ষণ এবং আধুনিক উন্নয়নের মিশ্রণে বিকশিত হচ্ছে, যা এটিকে পর্যটক এবং বিনিয়োগকারীদের উভয়ের জন্যই একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলেছে।